গরমে চুল পড়া হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, এটা বাংলাদেশে প্রায় সবারই হয়। শীতে সব ঠিকঠাক থাকলেও, মে-জুন মাস আসতেই গোসলের পর ফ্লোরে চুল, বালিশে চুল পড়ে থাকে। মনে হয় হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই চুল ঝরছে!
কারণ আসলে আছে এবং কারণটা বোঝা গেলে সমাধান করাও কঠিন না। বাংলাদেশের গরমটা শুধু গরম না, এখানে একসাথে গরম আর ভ্যাপসা ভাব থাকে, যেটা চুলের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।
সঠিক রুটিন জানলে এই সিজনেও চুল ভালো রাখা সম্ভব। এই ব্লগে পাবেন গরমে চুল পড়ার আসল কারণ, বাংলাদেশের ওয়েদারের জন্য সামার হেয়ার কেয়ার রুটিন এবং গরমে যে ভুলগুলো করলে চুল পড়া আরও বেড়ে যায়।
গরমে চুল পড়া বাড়ে কেন?
বাংলাদেশে গরমে চুল পড়ার মূলত চারটা বড় কারণ থাকে। প্রতিটা কারণ আলাদাভাবে চুলের ক্ষতি করে, আর সব কারণ একসাথে হলেই চুল পড়া অনেক বেড়ে যায়।
স্ক্যাল্পে ঘাম জমে থাকা
গরমে মাথায় যে পরিমাণ ঘাম হয় সেটা ঠিকমতো ক্লিন না হলে স্ক্যাল্পে ব্যাকটেরিয়া আর ফাঙ্গাস বাড়তে শুরু করে। এই ইনফেকশন থেকে স্ক্যাল্পে ইনফ্লামেশন হয়। ইনফ্লামেশন মানে ফলিকলের চারপাশে ক্ষতি হয়, এতে চুল গোড়া থেকে পড়তে শুরু করে।
অনেকে ভাবেন ঘাম হলে চুল পড়ে না, কিন্তু স্ক্যাল্পে জমে থাকা ঘামটাই আসল সমস্যা। বাইরে থেকে এসে মাথা না ধুলে বা ঘাম ঠিকমতো ক্লিন না করলে এই সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। Learn more.
হার্ড ওয়াটার আর রোদ একসাথে কাজ করে
পানিতে যদি ক্যালসিয়াম আর ম্যাগনেসিয়াম বেশি থাকে, গরমে বারবার মাথা ধুলে এই মিনারেল স্ক্যাল্পে জমতে থাকে এবং ফলিকল ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় রোদ, যা চুলের ভেতরের প্রোটিন আস্তে আস্তে নষ্ট করে দেয়।
দুটো কারণ একসাথে হলে চুল অনেক বেশি দুর্বল হয়ে যায় আর ব্রেকেজ বাড়ে। যারা গরমের সময় বাইরে বেশি সময় কাটান তাদের এই কারণেই চুল বেশি পড়তে দেখা যায়।
ডিহাইড্রেশন স্ক্যাল্পেও যায়
গরমে আমরা শরীর থেকে অনেক বেশি পানি হারাই। এই ডিহাইড্রেশনের প্রভাব শুধু শরীরে না, স্ক্যাল্পেও পড়ে। স্ক্যাল্প ড্রাই হয়ে গেলে ফলিকলে ঠিকমতো নিউট্রিয়েন্ট পৌঁছায় না। চুলের গোড়া দুর্বল হয়, আর দুর্বল গোড়া থেকে চুল সহজেই পড়ে যায়।
তাই গরমে পানি বেশি খাওয়া শুধু স্কিনের জন্য না, চুলের গোড়া স্ট্রং রাখতেও দরকার। অনেকে পানি কম খেয়েও চুল পড়া বাড়তে দেখেন, কিন্তু কারণটা ধরতে পারেন না।
শ্যাম্পুর ফ্রিকোয়েন্সি ভুল হলে দুদিক থেকে সমস্যা হয়
গরমে অনেকে প্রতিদিন শ্যাম্পু করা শুরু করেন। আবার অনেকে ঘাম হলেও চুল ক্লিন করেন না। দুটোই ভুল। প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে স্ক্যাল্পের ন্যাচারাল অয়েল নষ্ট হয়ে স্ক্যাল্প আরও বেশি ড্রাই হয়। আর চুল/ স্ক্যাল্প ক্লিন না করলে ঘামের বিল্ডআপ থেকে ড্যান্ড্রাফ হয়, যেটা থেকে চুল পড়া আরও বেড়ে যায়।
হিজাব পরলে গরমে সমস্যা একটু বেশি
যারা হিজাব পরেন, তাদের জন্য গরমটা একটু আলাদা চ্যালেঞ্জ। হিজাবের নিচে স্ক্যাল্পে বাতাস ঢুকতে পারে না, ঘাম বেশি জমে। এই ঘাম দিনের পর দিন ঠিকমতো ক্লিন না হলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন আর ড্যান্ড্রাফের চান্স অনেক বেড়ে যায়। চুলকানি শুরু হয়, চুলকাতে চুলকাতে ফলিকলে আরও প্রেশার পড়ে এবং চুল পড়া বাড়ে।
এই সমস্যা কমাতে হালকা কাপড়ের হিজাব পরুন। সপ্তাহে অন্তত ৩ বার স্ক্যাল্প ভালোভাবে ক্লিন করুন। হিজাব পরার আগে চুল পুরোপুরি শুকিয়ে নিন, ভেজা চুলে হিজাব পরলে ফাঙ্গাসের সমস্যা আরও বাড়ে। আর প্রতিদিনের রুটিনে স্ক্যাল্প ট্রিটমেন্ট সিরাম রাখুন, কারণ সারাদিন ঢেকে রাখা স্ক্যাল্পে ফলিকল অ্যাক্টিভ রাখতে সিরাম অনেক হেল্প করে।
বাংলাদেশের গরমে যে হেয়ার কেয়ার রুটিন কাজ করে
শীতের রুটিন গরমে তেমন কাজ করে না। গরমে চুলের যত্নটা একটু চেঞ্জ করে নিতে হয়। নিচের রুটিনটি বাংলাদেশের গরম ওয়েদারকে প্রায়োরিটি দিয়ে সাজানো হয়েছে।
স্টেপ ১: স্ক্যাল্পের জন্য সঠিক শ্যাম্পু বেছে নিন
গরমে ক্লিনজিং সবচেয়ে জরুরি, কারণ স্ক্যাল্পে ঘাম আর বিল্ডআপ বেশি হয়। সপ্তাহে ৩ বার শ্যাম্পু করুন। প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে স্ক্যাল্প ড্রাই হয়ে আরও বেশি তেল তৈরি শুরু করে এবং সমস্যা আরও বাড়ে।
স্ক্যাল্পে কি ঘামের বিল্ডআপ আছে বা ড্যান্ড্রাফ হচ্ছে? Tresemme Tea Tree Shampoo ব্যবহার করুন। এর টি ট্রি অয়েল ফাঙ্গাস কমায় আর ঘামের কারণে হওয়া চুলকানি বন্ধ করে। শ্যাম্পু করার সময় ফিঙ্গার টিপ দিয়ে স্ক্যাল্পে ২ মিনিট ম্যাসাজ করুন, তবে শুধু শ্যাম্পু লাগিয়ে ধুয়ে ফেললে কাজ হয় না।
চুলের গোড়া দুর্বল মনে হচ্ছে? Mielle Rosemary Mint Strengthening Shampoo ব্যবহার করুন। রোজমেরি আর বায়োটিন একসাথে স্ক্যাল্পে ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ায় এবং দুর্বল ফলিকল আবার ঠিক করতে হেল্প করে।
স্টেপ ২: কন্ডিশনার লাগান, তবে স্ক্যাল্পে না
গরমে হেভি কন্ডিশনার স্কিপ করুন। এটি স্ক্যাল্পে বিল্ডআপ বাড়ায়, আর চুল আরও হেভি ও প্যাচি লাগে। কন্ডিশনার চুলের মাঝ থেকে আগা পর্যন্ত অ্যাপ্লাই করুন, স্ক্যাল্পে দেবেন না। ২ থেকে ৩ মিনিট চুলে রেখে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
স্টেপ ৩: হেয়ার গ্রোথ সিরাম দিন
গোসলের পর ভেজা বা আধাশুকনো চুলে WishCare Hair Growth Serum স্ক্যাল্পে ম্যাসাজ করুন। গরমে উইক হয়ে যাওয়া ফলিকল আবার অ্যাক্টিভ করতে এই স্টেপটা সবচেয়ে বেশি কাজ করে।
অনেকেই এই স্টেপ বাদ দেন। শুধু শ্যাম্পু দিয়ে গরমে চুল পড়া পুরোপুরি কমে না। ফলিকলকে সাপোর্ট না দিলে চুল পড়া চলতেই থাকবে। সিরাম লাগানো মাত্র ২ মিনিটের কাজ, কিন্তু রেজাল্টের পার্থক্য অনেক।
স্টেপ ৪: অয়েল দিন তবে স্ক্যাল্পে না
গরমে স্ক্যাল্পে হেভি অয়েল দেওয়া ঠিক না। ঘামের সাথে মিশে আরও বেশি বিল্ডআপ হয়। অয়েল দিতে চাইলে Mielle Rosemary Mint
Oil চুলের মাঝ থেকে ডগায় লাগান। রাতে লাগিয়ে সকালে ধুয়ে ফেলুন। এটাই গরমে সেফ অয়েলিং মেথড্ এবং চুলকে নারিশড্ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়।
[গরমে চুল পড়া কমাতে সঠিক কম্বো দেখুন: carnesia.com/hair-fall-solution/]
গরমে চুলের জন্য কোন ইনগ্রেডিয়েন্ট খুঁজবেন?
শ্যাম্পু বা সিরাম কেনার সময় লেবেলে নিচের ইনগ্রেডিয়েন্টগুলো থাকলে গরমে চুলের জন্য ভালো কাজ করে।
রোজমেরি এক্সট্র্যাক্ট: স্ক্যাল্পে ব্লাড সার্কুলেশন বাড়ায় এবং ফলিকল অ্যাক্টিভ রাখে। গরমে ইউক হয়ে যাওয়া চুলের গোড়া স্ট্রং করতে এটা বেস্ট সলিউশন।
বায়োটিন: চুলের গোড়া শক্ত করে আর healthy hair growth support করে। শ্যাম্পু বা সিরামে বায়োটিন থাকলে সেটা গরমের জন্য ভালো অপশন।
টি ট্রি অয়েল: ফাঙ্গাস আর ব্যাকটেরিয়া দূর করতে কাজ করে, গরমে স্ক্যাল্প ফ্রেশ রাখে। বিশেষ করে যাদের ড্যান্ড্রাফ বা চুলকানির সমস্যা আছে তাদের জন্য দরকারি ইনগ্রেডিয়েন্ট।
জিঙ্ক পাইরিথিওন (জেডপিটিও): ড্যান্ড্রাফ কমায় আর গরমে ঘামের বিল্ডআপ থেকে স্ক্যাল্প প্রটেক্ট করে।
ক্যাফেইন: স্ক্যাল্পে সরাসরি ফলিকল স্টিমুলেট করে। হেয়ার গ্রোথ সিরামে এটা থাকলে রেজাল্ট আরও ভালো আসে।
গরমে যে ভুলগুলো করবেন না
প্রতিদিন শ্যাম্পু করা: গরমে প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে স্ক্যাল্প ড্রাই হবে এবং চুল পড়া আরও বাড়বে। তাই সপ্তাহে ৩ বারই যথেষ্ট।
ভেজা চুল বেঁধে রাখা: গোসলের পরপরই চুল বেঁধে রাখলে চুলের ব্রেকেজ বাড়ে। অন্তত ৭০% ড্রাই হওয়ার পর চুল বাঁধুন। ভেজা চুলে হিজাব পরলেও একই প্রবলেম হয়।
স্ক্যাল্পে হেভি অয়েল দেওয়া: ক্যাস্টর অয়েল বা যেকোনো হেভি অয়েল সরাসরি স্ক্যাল্পে দিলে বিল্ডআপ বেড়ে ড্যান্ড্রাফ হয়।
রোদে বের হলে চুল খোলা রাখা: সরাসরি রোদ চুলের প্রোটিন নষ্ট করে। বিশেষ করে দুপুরের রোদে বাইরে বের হলে স্কার্ফ বা ক্যাপ ব্যবহার করুন।
হেয়ার ড্রায়ার বেশি ব্যবহার করা: গরমে ড্রায়ারে চুল শুকালে চুলের প্রোটিন আরও বেশি ড্যামেজ হয়। তাই এই সিজনে চুল এয়ার ড্রাই করুন।
সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন
গরম শেষ হলে কি চুল পড়া নিজে থেকে কমে?
কিছুটা কমে কিন্তু পুরোটা না। গরমে যে ফলিকলগুলো দুর্বল হয়ে গেছে সেগুলো ঠিক করতে হেয়ার কেয়ার রুটিন মেনে চলতে হবে। শুধু সিজন চেঞ্জের জন্য ওয়েট করলে চুল আবার আগের মতো ঘন হবে না।
গরমে কতবার শ্যাম্পু করা উচিত?
সপ্তাহে ৩ বার। যদি বাইরে বেশিক্ষণ থাকেন বা ব্যায়াম করেন, তাহলে ৩ বার করুন। বেশিরভাগ সময় ঘরে থাকলে ২ বারেই হবে।
গরমে কি হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, তবে সপ্তাহে ১ বার যথেষ্ট। হেভি মাস্ক ইউজ না করে হালকা প্রোটিন বা ময়েশ্চার-বেসড মাস্ক বেছে নিন। গরমে হেভি মাস্ক স্ক্যাল্পে বিল্ডআপ বাড়াতে পারে।
গরমে চুল পড়া কমতে কতদিন লাগে?
পারফেক্ট হেয়ার কেয়ার রুটিন শুরু করলে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে চুল পড়া কমতে শুরু করে। প্রবলেম পুরোপুরি ঠিক হতে ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগতে পারে।
গরমে কোন অয়েল ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো?
গরমে লাইট টাইপের অয়েল ইউজ করা ভালো। রোজমেরি-বেসড অয়েল যেমন মিয়েলি রোজমেরি মিন্ট অয়েল গরমে চুলের জন্য ভালো কাজ করে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের গরমে চুলের যত্ন নিতে হলে এই সিজন বুঝে প্রোডাক্ট সিলেক্ট করতে হবে। শীতের রুটিন এইসময় কাজ করে না। সঠিক শ্যাম্পু, সিরাম আর অয়েল মিলিয়ে একটা ছোট রুটিন ফলো করলেই গরমে চুল পড়া অনেকটা কমানো যায়।
Carnesia-র হেয়ার ফল সলিউশন পেজে আপনার সমস্যা অনুযায়ী কিউরেটেড কম্বো পাবেন। সব প্রোডাক্ট ১০০% অরিজিনাল, সারা বাংলাদেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি দেওয়া হয়।
